অপ্রকাশিত অনুভূতি: নিশাতের গল্প
একটি ছোট শহরে বসবাস করতেন নিশাত, একজন সাধারণ গৃহিণী, যিনি বিয়ে করেছিলেন একজন সৎ ও কর্মঠ পুরুষ রনি। সংসার, পরিবার, আর সমাজের দায়িত্ব—এসবই তার জীবনের মূল ভিত্তি ছিল। নিশাতের স্বামী, রনি, একজন ব্যাংক কর্মকর্তা, সবসময় ব্যস্ত থাকে তার কাজ নিয়ে। যেহেতু তাদের সম্পর্ক ছিল একটি রুটিনমতো গড়ানো দাম্পত্য, সেহেতু নিশাত মাঝে মাঝে নিজের অনুভূতিতে একা হয়ে পড়তো। তবে, সে তার পরিবার এবং দায়িত্বের প্রতি সচেতন ছিল, তাই কখনো নিজের মনের কথা কাউকে বলেনি।
তবে, একদিন অফিসে ফরহাদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ফরহাদ, একজন তরুণ ও উদ্যমী ছেলেকে খুব সহজেই মানুষ বুঝতে পারে। সবার সঙ্গে মিশতে সে ছিল অত্যন্ত সহজgoing এবং হাস্যোজ্জ্বল। নিশাত প্রথমেই লক্ষ্য করল ফরহাদের মধ্যে কিছু আলাদা ছিল—সে ছিল অত্যন্ত আন্তরিক, বন্ধুত্বপূর্ণ এবং তার হৃদয়ের গভীরতায় এক ধরনের বোধশক্তি ছিল, যা নিশাতের কাছে অদ্ভুতভাবে আকর্ষণীয় মনে হলো।
ফরহাদ অফিসে নতুন এসেছিল, এবং শুরু থেকেই নিশাতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রথম প্রথম তারা শুধু অফিসের কাজ নিয়ে কথা বলতো, কিন্তু একদিন একটি কাজের কারণে তারা দুজনেই একসাথে বাইরে চা খেতে যায়। সেই সন্ধ্যাটি নিশাতের জীবনে এক টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায়।
“তুমি জানো, মাঝে মাঝে মনে হয় আমার জীবনটা যেন এক নিরবতা হয়ে গেছে,” ফরহাদ বলল চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে। “তোমাদের মতো মানুষ যারা ভালোবাসা আর সংসারের জন্য প্রতিদিন সবকিছু দিয়ে দেয়, তাদের জীবনে কখনো কখনো কিছু কিছু অনুভূতি চাপা পড়ে যায়। আর কিছু কিছু মুহূর্তে মানুষ মনে করে, আসলেই কি সে নিজের জীবনের সঙ্গে খুশি?”
নিশাত হঠাৎ করে থেমে যায়। ফরহাদের কথা তার মনকে স্পর্শ করে। তার নিজের জীবনও ঠিক তেমনই—এমন কিছু মুহূর্তে মনে হয়, সে কখনো তার মনের কথা শোনেনি। সংসারের দায়িত্বে পড়ে সে নিজের অস্তিত্বকে খুঁজে পাচ্ছে না। তার স্বামী রনি এক ভালো মানুষ, কিন্তু সব কিছু পরিকল্পনা, কর্ম এবং স্বার্থকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তিনি কখনো তাকে সেই তীব্র ভালোবাসা বা আবেগের অনুভূতি দেননি, যা নিশাত চেয়েছিল।
ফরহাদের কথা শোনার পর, নিশাত বুঝতে পারল যে, এই অনুভূতিগুলো খুব স্বাভাবিক। মাঝে মাঝে মানুষ হৃদয়ের গভীর থেকে এমন কিছু অনুভূতি অনুভব করে, যা একসময় অস্বীকার করা যায় না। আর সেই অনুভূতির অংশ হিসেবে ফরহাদ ছিল তার জীবনের এক বিশেষ চরিত্র। কিন্তু নিশাত জানতো, সে একটি বিবাহিত নারী এবং সমাজের কাঠামো অনুযায়ী, তার জন্য ফরহাদ বা অন্য কোনো পুরুষের প্রতি এমন অনুভূতির প্রকাশ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়বার তাদের মধ্যে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। একদিন অফিসে ফরহাদ বলল, “নিশাত, কখনো কি ভেবে দেখেছো, জীবনে আমাদের বড় দায়িত্বগুলো আমাদের নিজস্ব অনুভূতিগুলোর চেয়ে বেশি হয়ে দাঁড়ায়? কিন্তু তারপরও, জীবন থেকে ছোট ছোট ভালোবাসা ও অনুভূতিগুলো কখনো হারিয়ে যায় না।”
নিশাত বুঝতে পারে, ফরহাদ যে কথাগুলো বলছে, তা যেন তার জীবনের প্রতিচ্ছবি। সে নিজের অনুভূতিকে মনে মনে অস্বীকার করার চেষ্টা করে, কিন্তু ফরহাদের সান্নিধ্যে এসে তার হৃদয়ে অজানা এক অনুভূতি জেগে ওঠে।
একদিন নিশাত যখন তার স্বামী রনির সাথে গল্প করছিল, হঠাৎ করে তার মনে হলো—সে নিজে একটা জড়তা অনুভব করছে। তার মন যে কারও জন্য উন্মুক্ত হতে চায়, সেটা ফরহাদের কথা মনে পড়তেই আরও পরিষ্কার হয়ে যায়। কিন্তু নিশাত জানতো, তার জীবনে এগিয়ে যাওয়ার কোনো পথ নেই। স্বামী, পরিবার এবং দায়িত্ব সবকিছু একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে।
তবে, ফরহাদও ঠিক জানত না যে, নিশাত তার প্রতি এমন অনুভূতি পোষণ করে। সে কখনো সরাসরি নিশাতের কাছে এ বিষয়ে কিছু বলেনি। তবে, একদিন যখন তারা দুজন একসঙ্গে অফিসের কাজ শেষ করে ফিরছিল, ফরহাদ মৃদু হাসি দিয়ে বলল, “কখনো কখনো জীবনে কিছু সম্পর্ক থাকে, যেগুলো হৃদয়ের মধ্যে জায়গা করে নেয়, কিন্তু সে সম্পর্ক ঠিকভাবে ফুটে ওঠে না।”
নিশাত মাথা নিচু করে হাঁটছিল, তার মন এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে ডুবে গিয়েছিল। সে জানতো, তার জীবনের চলমান প্রেক্ষাপটে এই সম্পর্ক কখনোই বাস্তবে পরিণতি পাবে না। কিন্তু তবুও, ফরহাদের প্রতি তার এই অনুভূতি একে অপরের প্রতি সেই নীরব ভালোবাসার প্রতীক হয়ে রয়ে গেল।
বয়স, দায়িত্ব, সামাজিক কাঠামো—এগুলো সব কিছুই তাদের পথের প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু নিশাত জানে, তার জীবনে এই অনুভূতি থাকবে, যেহেতু এই সম্পর্ক তাকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়, তাকে তার নিজের মনের কথা শোনায়।
0 Comments